Wednesday, June 6, 2007

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালাঃ অরোরা (৬)











Chena হট স্প্রিং দেখতে যাওয়ার সময় একটু ধীরে চালাচ্ছিলাম, এই রাস্তায় তুলনামূলকভাবে গাড়ী আছে অনেক, মাঝে মাঝে ট্যুরিস্ট বাস৷ ঠিক কেন জানি না জিপিএস সিগনাল ঠিকমত কাজ করছিল না৷ আলাস্কায় এসে এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে যে জিপিএস ঠিক মতো পজিশন বের করতে পারছে না ম্যাপের স্বাপেক্ষে৷ বারোটার দিকে পৌছলাম হটস্প্রিং এর ওখানে, একটা বড় লজিং ছিল, অনেক লোকজন এত রাতেও৷ অবশ্য পথেও অনেককে দেখেছি ক্যাম্পিং করছে৷ হটস্প্রিং লোকজন জামা কাপড় খুলে গোসল করছে, আমরা যখন পৌছেছি ততক্ষনে গোসলের এলাকার ভীড় হালকা হয়ে গেছে৷ তাও আশেপাশে বেশ কিছুক্ষন ঘুরঘুর করলাম, মনে মনে নামতেও ইচ্ছা হচ্ছিল, একা থাকলে হয়তো তাই করতাম, কিন্তু এত পরিচিতদের মধ্যে আর সাহস করলাম না৷

এখানে আসার আসল উদ্দ্যেশ্য হলো অরোরা দেখা৷ অরোরা হচ্ছে সুর্য থেকে আসা সোলার পার্টিকলের সাথে পৃথিবীর ম্যগনেটিক ফিল্ডের সংঘর্ষে এক ধরনের আলোর বিচ্ছুরণ৷ দুই মেরু এলাকাতে দেখা যায়৷ বিশেষ করে আর্কটিক কিংবা এন্টার্কটিক সার্কেলের আশেপাশে৷ যে সময় সোলার এ্যাক্টিভিটি বেশী থাকে যেমন সানস্পট (সৌরকলঙ্ক) গুলো যখন দেখা যায়, তখন অরোরাও বেশী এ্যাক্টিভ থাকে৷ দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমরা যে সময় গিয়েছিলাম ঐ সময় অরোরাল এ্যক্টিভিটি কমের দিকে ছিল৷ সবুজাভ ছাড়া আর কোন রঙের অরোরা দেখার সুযোগ হয় নি, যাওয়ার আগে ছবিতে নানা রঙের অরোরা দেখে ঐরকম দেখবো ভেবেছিলাম৷

অরোরার আশায় মোটেলটার সামনে ঘোরাঘুরি করছিলাম আমরা৷ অন্ধকার কিন্তু অনেক লোকজন, মোটেলের ভাড়াটেরা তো আছেই আমাদের মতো এরকম বহিরাগতও অনেক৷ সবাই অরোরার আশায়, একজায়গায় এক দোকানদার আবার একটা টিভিতে অরোরা দেখাচ্ছিল, প্রথমে ভেবেছিলাম লাইভ বুঝি, পরে দেখি নাহ পুরোনো কোন আমলের একটা মুখস্থ ভিডিও চালাচ্ছে কাস্টমার আকৃষ্ট করার জন্য৷ আলাস্কা আসার অল্প আগেই ক্যাননের নতুন এসএলআর টা কিনেছিলাম, তাড়াহুড়ায় ম্যানুয়ালটা পড়াও হয় নি৷ অপেক্ষা করতে করতে ভাবলাম তাহলে একবার একটা মহড়া দিয়ে নেই৷ ৩০ সেকেন্ডের লম্বা এক্সপোজারে ছবি তুলতে হবে৷

ঠিক তখনই ঝামেলা বাধিয়ে ফেললাম৷ কি যেন একটা সেটিংস চেঞ্জ করার পর দেখি এখন আর ম্যানুয়াল এক্সপোজার হচ্ছে না৷ কয়েকবার এদিক ওদিক ছবি তোলার চেষ্টা করলাম, নাহ কোন ছবিই উঠছে না৷ ঘটনা কি? সেলফোনের আলোতে ম্যানুয়াল পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, কোথায় গন্ডগোল হলো৷ এর মধ্যে দেখি লোকজনের চিৎকার অরোরা দেখা যাচ্ছে৷ পাহাড় ঘেষে অল্প অল্প করে সবুজাভ ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো, ক্রমশ বেশী৷ ঢেউটা একসময় মাঝ আকাশে চলে এলো, দুঃখে-কষ্টে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছিল, শালার ক্যামেরা এই সময় গোলমাল শুরু করছে৷

দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল অরোরা৷ দৌড়ে মোটেলের লবিতে গেলাম, ম্যানুয়ালটা এখন বুঝতে হবে, নিশ্চয়ই কোথাও আছে৷ লবিতে একটা স্টাফড বল্গা হরিন, ওটার দিকে ক্যামেরা রেখে চেষ্টা করতে দেখি এখন ঠিক হয়েছে৷ আবার আকাশের দিকে তাক করলে সেই একই সমস্যা৷ কোথায় যে ঘাপলা হয়েছে বুঝলাম না৷ হুম, কম আলোতে ছবি তুলতে গেলেই সমস্যাটা হচ্ছে, কিন্তু প্লেনে বসেও তো এভাবে ছবি তুলেছি তখন সমস্যাটা হয় নি৷ একজন বুদ্ধি দিল সব অটোমেটিক মোড বন্ধ করে দিতে, ম্যানুয়াল ঘেটে ঘটে তাই করলাম, কাজ হয়েছে বলতে হবে৷ এখন ছবি উঠছে৷

এবার খুব সিরিয়াসলি অপেক্ষা করতে লাগলাম অরোরার জন্য৷ মাঝে মাঝে সামান্য দেখা গিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু বড় আকারে আর হচ্ছে না৷ তবুও যা দেখা যাচ্ছে ছবি তুলে নিলাম৷ ফেরা দরকার, ঘড়িতে রাত দুটো বাজে৷ বাসে যে সব লোক এসেছিল তারা ফিরে যাচ্ছে৷ আমরাও গোছগাছ করে রওনা হলাম, অনেকে এর মধ্যে প্রথম দফা অরোরা দেখে গাড়ীতেই ঘুমিয়ে গেছে৷

হট স্প্রিং এলাকার গেট থেকে বের হয়ে ৫/১০ মিনিট আসতেই দেখি আবার বড় করে অরোরা দেখা যাচ্ছে৷ তাড়াহুড়ো করে রাস্তার পাশে গাড়ী দাড় করালাম, এমন ঘুটঘুটি অন্ধকার রাস্তার পাশে ঠিক কতটুকু জায়গা আছে বোঝা যাচ্ছে না৷ রেন্টাল কার নিয়ে খাদে পড়লে এখানে উদ্ধার পেতে সকাল হয়ে যাবে৷ একজন গাড়ী থেকে নেমে ছবি তোলা শুরু করলো (ছবিগুলো দিয়েছি এখানে)৷ বাকীরা গাড়ীতে বসে রইলাম৷ আমার একটু ভয় ভয় করছিল, বেয়ার কান্ট্রি, রাস্তার দুপাশেই খোলা জঙ্গল, কোন লোকালয়ের চিহ্ন নেই৷ অনেক ডাকাডাকির আমাদের বন্ধু ফেরৎ আসলো গাড়ীতে, একটু ওভার এক্সাইটেড হয়ে গেছে অরোরা দেখতে গিয়ে৷ ঠিক তখনই খেয়াল করলাম আমাদের গাড়ীর একটু সামনেই বাছুরের সমান সাইজের একটা সাদা নেকড়ে৷ হেড লাইটের আলোতে চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে৷

বাকী রাস্তা নেকড়েটা আক্রমন করলে কি হত তা নিয়ে আর আমাদের বন্ধুর নির্বুদ্ধিতার জন্য সবাই মিলে কি বিপদে পড়তে যাচ্ছিলাম এই নিয়ে আলোচনা করতে করতে সময় কেটে গেল৷

No comments:

 
eXTReMe Tracker